🏠 Home | ইসলামিক | SEO | Grammar | Health | Education | Contact

রবিবার, ৬ জুলাই, ২০২৫

হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B)

 


হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B): একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ - কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B) একটি গুরুতর লিভারের সংক্রমণ, যা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) দ্বারা সৃষ্ট হয়। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত, এবং এটি লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis), লিভার ক্যান্সার (Hepatocellular Carcinoma) এবং লিভার ফেইলিউরের (Liver Failure) অন্যতম প্রধান কারণ। হেপাটাইটিস বি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

হেপাটাইটিস বি কী?

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস লিভার কোষে আক্রমণ করে এবং লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করে, যার ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ তীব্র (Acute) বা দীর্ঘস্থায়ী (Chronic) উভয়ই হতে পারে।

  • তীব্র হেপাটাইটিস বি (Acute Hepatitis B): এটি সংক্রমণের প্রথম ৬ মাসের মধ্যে ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে, শরীর নিজে থেকেই ভাইরাসটিকে নির্মূল করে দেয় এবং ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে কিছু ক্ষেত্রে, তীব্র সংক্রমণ গুরুতর রূপ নিতে পারে এবং এমনকি লিভার ফেইলিউরের কারণ হতে পারে।

  • দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি (Chronic Hepatitis B): যদি ৬ মাস পরেও ভাইরাস শরীর থেকে নির্মূল না হয়, তবে এটিকে দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ বলা হয়। শিশুরা যারা জন্মের সময় বা শৈশবে HBV দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে (প্রায় ৯০%)। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কম (৫-১০%)। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ বছরের পর বছর ধরে লিভারের ক্ষতি করতে পারে এবং গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

সংক্রমণের কারণ ও পদ্ধতি:

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস মূলত রক্ত, বীর্য এবং অন্যান্য শারীরিক তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সাধারণ স্পর্শ, হাঁচি, কাশি, খাবার বা পানি ভাগ করে নেওয়া, অথবা একই পাত্রে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায় না। সংক্রমণের প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো:

  1. জন্মের সময় (Perinatal Transmission): হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে শিশুর জন্মকালীন সময়ে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। এটি বিশ্বব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ কারণ।

  2. যৌন সম্পর্ক: অরক্ষিত যৌন মিলনের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে।

  3. রক্তের মাধ্যমে:

    • দূষিত রক্ত ​​সঞ্চালনের মাধ্যমে।

    • স্টেরাইল নয় এমন সূঁচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার (যেমন মাদকাসক্তদের মধ্যে সূঁচ ভাগ করে নেওয়া)।

    • অপরিষ্কার বা দূষিত যন্ত্রপাতি দিয়ে ট্যাটু বা শরীর ছিদ্র করা (body piercing)।

    • চিকিৎসাজনিত সরঞ্জাম বা দাঁতের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে, যদি সেগুলো সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করা হয়।

  4. ব্যক্তিগত সামগ্রী ভাগ করে নেওয়া: রেজার, টুথব্রাশ, পেরেক কাটার যন্ত্র ইত্যাদি, যা রক্ত ​​বা অন্যান্য শারীরিক তরল দ্বারা দূষিত হতে পারে, অন্যের সাথে ভাগ করে নিলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

লক্ষণসমূহ:

অনেক ক্ষেত্রে, হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ অনুভব করেন না। যখন লক্ষণ দেখা দেয়, তখন সেগুলো হতে পারে:

  • ক্লান্তি ও অবসাদ

  • জ্বর

  • ক্ষুধামন্দা ও বমি বমি ভাব

  • পেটে ব্যথা (বিশেষ করে ডান উপরের অংশে, লিভারের কাছাকাছি)

  • গাঢ় প্রস্রাব

  • ফ্যাকাশে বা ধূসর মল

  • চোখ ও চামড়ায় হলদে ভাব (জন্ডিস)

  • জয়েন্টে ব্যথা

দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো দেরিতে প্রকাশ পেতে পারে, যখন লিভারের গুরুতর ক্ষতি, যেমন সিরোসিস বা ক্যান্সার ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।

রোগ নির্ণয়:

হেপাটাইটিস বি নির্ণয়ের জন্য রক্ত ​​পরীক্ষা (Blood Tests) অপরিহার্য। এই পরীক্ষাগুলো ভাইরাসের অ্যান্টিজেন (Antigen) এবং অ্যান্টিবডি (Antibody) সনাক্ত করে, যা সংক্রমণ আছে কিনা, সংক্রমণটি তীব্র নাকি দীর্ঘস্থায়ী, এবং ব্যক্তি টিকা দ্বারা সুরক্ষিত কিনা তা নির্ধারণে সহায়তা করে। অন্যান্য পরীক্ষা যেমন লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT), আল্ট্রাসাউন্ড (Ultrasound) এবং প্রয়োজনে লিভার বায়োপসি (Liver Biopsy) লিভারের ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়ে সাহায্য করে।

জটিলতা:

দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি যদি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি লিভারের মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে:

  1. লিভার সিরোসিস: লিভারের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ফলে লিভারে ক্ষত (scarring) তৈরি হয়, যা সিরোসিস নামে পরিচিত। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করে।

  2. লিভার ক্যান্সার (Hepatocellular Carcinoma): হেপাটাইটিস বি বিশ্বব্যাপী লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ।

  3. লিভার ফেইলিউর: লিভার সম্পূর্ণভাবে তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেললে লিভার ফেইলিউর হয়, যা জীবন-হুমকির কারণ।

চিকিৎসা পদ্ধতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। হেপাটাইটিস বি এর মতো জটিল রোগের ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা (আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা): হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসার জন্য অ্যালোপ্যাথিক পদ্ধতিই বর্তমানে সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত এবং কার্যকর হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। অ্যান্টিভাইরাল ঔষধ (যেমন Tenofovir, Entecavir) ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরি বন্ধ করে লিভারের ক্ষতি কমায়। গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনও করা হয়।

    • বিশেষজ্ঞ ও হাসপাতাল: বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসার জন্য গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোলজি এবং মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU), ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অফ বাংলাদেশ, ইউনাইটেড হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল, স্কয়ার হাসপাতাল সহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হেপাটাইটিস বি-এর আধুনিক চিকিৎসা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা রয়েছে। রোগীদের উচিত সর্বদা সরকারিভাবে নিবন্ধিত, অভিজ্ঞ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা হেপাটোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া।

  • হোমিওপ্যাথি, ভেষজ ঔষধ (বনাজি/হারবাল) এবং অন্যান্য বিকল্প চিকিৎসা: বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথি, বিভিন্ন ভেষজ ঔষধ বা হারবাল পণ্য এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিও প্রচলিত। কিছু ভেষজ উপাদান লিভারের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে, তবে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণ সরাসরি নিরাময়ের ক্ষেত্রে এদের কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় এবং এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

    • অনেক সময় এসব পদ্ধতির অপব্যবহার বা অকার্যকর চিকিৎসার ফলে রোগের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে কেবল এইসব পদ্ধতির উপর নির্ভর করে আধুনিক চিকিৎসা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

করণীয়: সঠিক চিকিৎসা ও প্রতারণা থেকে সুরক্ষা

  1. যোগ্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন: হেপাটাইটিস বি একটি জটিল রোগ, যা লিভারের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। তাই, সর্বদা একজন রেজিস্টার্ড ও অভিজ্ঞ অ্যালোপ্যাথিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা হেপাটোলজিস্টের কাছে যান। কোনো অপেশাদার বা অযোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

  2. নির্ভরযোগ্য হাসপাতালের নির্বাচন: রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার বেছে নিন।

  3. প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন:

    • চটকদার বিজ্ঞাপন: হেপাটাইটিস বি "সম্পূর্ণ নিরাময়" করার মিথ্যা দাবি করে এমন চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হবেন না। প্রায়শই এই ধরনের দাবিগুলো ভিত্তিহীন এবং রোগীদের আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির কারণ হয়।

    • অজ্ঞাত সূত্র থেকে ঔষধ: কোনো প্রকার লাইসেন্সবিহীন বা উৎসবিহীন ভেষজ, হারবাল বা অন্য কোনো ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকুন, যা আপনার লিভারের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।

    • পরীক্ষা ছাড়া চিকিৎসা: কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই হেপাটাইটিস বি নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দেয় এমন কারো কাছ থেকে দূরে থাকুন।

    • যাচাই করুন: চিকিৎসকের ডিগ্রি, নিবন্ধন এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) ওয়েবসাইট থেকে চিকিৎসকের নিবন্ধন যাচাই করা যেতে পারে।

  4. টিকা গ্রহণ (Vaccination): হেপাটাইটিস বি এর জন্য অত্যন্ত কার্যকর এবং নিরাপদ টিকা রয়েছে। শিশুদের জন্মের পরপরই এই টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া উচিত এবং এরপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাকি ডোজগুলো সম্পূর্ণ করা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, যেমন স্বাস্থ্যকর্মী, রক্ত ​​গ্রহীতা, বা হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গীরাও টিকা নিতে পারেন।

  5. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ অভ্যাস:

    • ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

    • নিরাপদ যৌন সম্পর্ক অনুশীলন করুন।

    • অন্যের ব্যক্তিগত সামগ্রী (রেজার, টুথব্রাশ) ব্যবহার করবেন না।

    • অপরিষ্কার সূঁচ বা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে ট্যাটু বা বডি পিয়ার্সিং করাবেন না।

    • রক্ত ​​সঞ্চালনের আগে রক্ত ​​পরীক্ষা নিশ্চিত করুন।

  6. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: যদি আপনি হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হন, তবে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন এবং লিভারের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান।

শেষ কথা:

হেপাটাইটিস বি একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সময়মতো চিহ্নিত না হলে এবং সঠিক চিকিৎসা না নিলে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার নিয়মাবলী মেনে চলা। রোগ নির্ণীত হলে, বিজ্ঞানভিত্তিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার উপর আস্থা রাখুন এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলুন। ভুল বা অপচিকিৎসার ফাঁদে পড়ে যেন আপনার মূল্যবান স্বাস্থ্য আরও ঝুঁকির মুখে না পড়ে, সেদিকে সর্বদা সতর্ক থাকুন। সুস্থ থাকুন, সুরক্ষিত থাকুন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

গাজওয়াতুল হিন্দ — অর্থ, হাদিস ও আধুনিক ব্যাখ্যা | জানারখীল মাধ্যম গাজওয়াতুল হিন্দ — অর্থ, হাদিস ও আধুনিক ব্যাখ্যা...