ভূমিকাঃ
বর্তমান যুগে তরুণ-তরুণীদের মাঝে প্রেম একটি বহুল প্রচলিত বিষয়। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারে এই বিষয়টি আরও বেশি উন্মুক্ত হয়েছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম এবং সম্পর্ক স্থাপনের কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এই আর্টিকেলে ইসলামের আলোকে তরুণ-তরুণীদের প্রেম নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা করব এবং এর সামাজিক ও শিক্ষাজীবনে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে আলোকপাত করব।
ইসলামে প্রেম ও বিবাহের গুরুত্ব
ইসলামে প্রেমকে অস্বীকার করা হয় না। বরং, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও রহমতের কথা উল্লেখ করেছেন। সূরা রুমের ২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে,
"এবং তাঁর নিদর্শনাবলীসমূহের মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।"
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাম্পত্য জীবনে প্রেম ও ভালোবাসা আল্লাহরই দান।
তবে, ইসলামে বিবাহের পূর্বের সম্পর্ককে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বিবাহ হলো একটি পবিত্র বন্ধন, যা নারী ও পুরুষকে বৈধভাবে একত্রিত হওয়ার সুযোগ দেয় এবং এর মাধ্যমেই সম্পর্ককে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
বিবাহের পূর্বে সম্পর্ক: ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে বিবাহের পূর্বে কোনো প্রকার শারীরিক সম্পর্ক তো দূরের কথা, এমন কোনো সম্পর্ক স্থাপনকেও নিরুৎসাহিত করা হয়, যা ফিতনা বা ফেতনার কারণ হতে পারে। এর মূল কারণ হলো, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক সমাজে অনৈতিকতা, বিশৃঙ্খলা এবং বহু সমস্যার জন্ম দেয়।
দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ: আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে পুরুষ ও নারী উভয়কেই তাদের দৃষ্টি নত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা নূর-এর ৩০ আয়াতে পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, "মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।" একই সূরার ৩১ আয়াতে নারীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, "মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে..."। এর অর্থ হলো, পরপুরুষ বা পরনারীর দিকে কুদৃষ্টিতে তাকানো থেকে বিরত থাকা।
একান্ত সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ: ইসলামে মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম) ব্যতীত কোনো পুরুষের সাথে কোনো নারীর নির্জনে সাক্ষাৎ করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে একত্রিত না হয়, কেননা তৃতীয়জন হয় শয়তান।" (তিরমিযী)। এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, নির্জনতা পাপের পথ উন্মুক্ত করে।
অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা পরিহার: তরুণ-তরুণীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা এবং অবাধ বিচরণের সুযোগ ইসলামে নেই। এর কারণ হলো, এসব ক্ষেত্র শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং পাপের দিকে ধাবিত করার পথ খুলে দেয়।
শারীরিক সম্পর্ক হারাম: বিবাহের পূর্বে যেকোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক ইসলামে সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং কবিরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা ইসরা: ৩২)। এই আয়াতটি শুধু ব্যভিচার থেকে বিরত থাকতে বলেনি, বরং এর কাছে যেতেও নিষেধ করেছে, যা অনৈতিক সম্পর্কের প্রাথমিক ধাপগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে। এর পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাতে অত্যন্ত ভয়াবহ।
আধুনিক প্রেমের নামে অনৈতিকতা ও এর ক্ষতিকর প্রভাব
বর্তমান সমাজে প্রচলিত প্রেম প্রায়শই ইসলামের নীতিমালার পরিপন্থী। অবাধ মেলামেশা, ডেটিং, এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এই ধরনের প্রেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সমাজে এবং তরুণ-তরুণীদের ব্যক্তিগত জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে:
শিক্ষাজীবনে প্রভাব:
পড়াশোনায় অমনোযোগিতা: প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মন পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হয়। সম্পর্কের টানাপোড়েন, দেখা-সাক্ষাতের পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।
পরীক্ষায় খারাপ ফল: মনোযোগের অভাবে পরীক্ষায় খারাপ ফল করা একটি সাধারণ পরিণতি। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ক্লাস ফাঁকি দেয় বা পড়ালেখার পেছনে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা: স্কুল-কলেজের আঙিনায় প্রেমের নামে অনৈতিক কার্যকলাপ, ইভটিজিং এবং গ্যাং কালচারের জন্ম হতে পারে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করে।
সামাজিক ও মানসিক প্রভাব:
পারিবারিক বিচ্ছেদ ও কলহ: প্রেমের সম্পর্ক অনেক সময় পারিবারিক সম্মতি ছাড়া হয়, যা পরিবারে অশান্তি ও কলহের জন্ম দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সাথে সন্তানদের দূরত্ব তৈরি হয়।
মানসিক চাপ ও হতাশা: প্রেমের সম্পর্কে ব্রেকআপ বা প্রতারণার শিকার হলে তরুণ-তরুণীরা তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা এবং বিষণ্ণতায় ভোগে। এর ফলে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়।
ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বৃদ্ধি: বিবাহের পূর্বের সম্পর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির মতো জঘন্য অপরাধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক বিশৃঙ্খলা: অবাধ মেলামেশা এবং অনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। এতে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
আস্থার সংকট: প্রেমের সম্পর্কে প্রতারণার শিকার হলে ব্যক্তি পরবর্তীতে যেকোনো সম্পর্কের প্রতি আস্থা হারায়, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইসলামের সমাধান: সুস্থ সম্পর্ক ও সহজ বিবাহ
ইসলাম তরুণ-তরুণীদের জন্য একটি সুস্থ ও পবিত্র জীবনযাপনের পথ বাতলে দিয়েছে। যদি কোনো তরুণ বা তরুণী বিবাহের প্রতি আগ্রহী হয় এবং নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, তবে তার জন্য দ্রুত বিবাহের ব্যবস্থা করা উচিত।
বিবাহকে সহজ করা: অভিভাবক এবং সমাজকে বিবাহকে সহজলভ্য করতে হবে। যৌতুক এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনা উচিত, যাতে তরুণ-তরুণীরা সহজেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"সর্বোত্তম বিবাহ সেটাই, যা সহজে সম্পন্ন হয়।" (বায়হাকী)।
অভিভাবকদের ভূমিকা: অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের ইসলামিক মূল্যবোধের উপর গড়ে তোলা এবং বিবাহের বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করা। সন্তানরা যাতে কোনো ভুল পথে পা না বাড়ায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা অভিভাবকদের দায়িত্ব।
পবিত্রতা ও নৈতিকতা: মুসলিম তরুণ-তরুণীদের উচিত নিজেদেরকে পবিত্র ও নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখা। সাময়িক আনন্দ বা আবেগপ্রবণতার বশে এমন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়, যা তাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই নষ্ট করে দেয়।
পরিশেষে
ইসলামে প্রেমকে একটি মহৎ অনুভূতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা হতে হবে বিবাহের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ। বিবাহের পূর্বে অনৈতিক সম্পর্ক, অবাধ মেলামেশা এবং শারীরিক সম্পর্ক ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এসব সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, বরং সমাজ ও শিক্ষাজীবনেও মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তরুণ-তরুণীদের উচিত আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে একটি পবিত্র ও সফল জীবন গঠন করা। এর মাধ্যমেই তারা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে পারবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন