ভুমিকা:
ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (দীন)। এই জীবনব্যবস্থার অংশ হিসেবে রাজনীতিরও একটি সুনির্দিষ্ট ধারণা ইসলামে বিদ্যমান। ইসলামের আলোকে রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা দখলের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটিকে একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (হাকিমিয়াত) প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবজাতির কল্যাণ নিশ্চিত করা। কীভাবে ইসলাম রাজনীতিকে একটি ইবাদত এবং মানবতার সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখে, আসুন তা কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
ইসলামী রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
ইসলামী রাজনীতির উদ্দেশ্য হলো এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করা, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর আইন (শরিয়াহ) প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল মানুষ ন্যায়বিচার, শান্তি ও নিরাপত্তা ভোগ করবে।
আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা: ইসলামী রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর দেওয়া বিধান অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন:
"আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।" (সূরা মায়েদা, ৫:৪৪)
ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা: ইসলামে আদল (ন্যায়বিচার) সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। ইসলামী শাসনব্যবস্থা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য দৃঢ়ভাবে ন্যায়বিচারের সাক্ষ্যদাতা হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।" (সূরা নিসা, ৪:১৩৫)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"এক ঘণ্টার ন্যায়বিচার সত্তর বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।" (বায়হাকি)
সামাজিক কল্যাণ ও মানবসেবা (ইহসান ও তা'আবুন): ইসলামী রাষ্ট্র দরিদ্র, অসহায় ও নিপীড়িতদের সাহায্য করা এবং জনকল্যাণমূলক কাজ করাকে তাদের মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন:
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরের সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একে অপরের সাহায্য করো না।" (সূরা মায়েদা, ৫:২)
নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার বিকাশ: ইসলামী রাজনীতি কেবল পার্থিব উন্নয়নের দিকেই নজর দেয় না, বরং মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকেও গুরুত্ব দেয়। সমাজে সৎ কাজের আদেশ (আমর বিল মারুফ) ও অসৎ কাজের নিষেধ (নাহি আনিল মুনকার) প্রতিষ্ঠা করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করো।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)
ইসলামী মূল্যবোধের সংরক্ষণ: সমাজে ইসলামী শিক্ষা ও নিদর্শনসমূহের স্বমহিমায় পুনরুজ্জীবন এবং ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ইসলামী শাসনব্যবস্থার মূলনীতিসমূহ: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে
ইসলামী শাসনব্যবস্থা কিছু মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, যা কুরআন ও হাদিস দ্বারা নির্দেশিত:
আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (হাকিমিয়াতুল্লাহ): ইসলামী রাজনীতিতে সকল ক্ষমতার উৎস একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। শাসক বা সরকার আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর আইন বাস্তবায়ন করেন।
"জেনে রেখো, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। বরকতময় আল্লাহ জগতসমূহের প্রতিপালক।" (সূরা আরাফ, ৭:৫৪)
হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন:
"হে আমার বান্দারা, আমি নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং একে অপরের উপর জুলুম করো না।" (সহীহ মুসলিম)
কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তি: রাষ্ট্রের সকল বিধি-বিধান, আইন ও বিচারব্যবস্থা কুরআন ও সুন্নাহর উপর ভিত্তি করে প্রণীত ও পরিচালিত হবে।
"তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে, তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাকো।" (সূরা নিসা, ৪:৫৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন:
"আমি তোমাদের মাঝে এমন দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা তোমরা দৃঢ়ভাবে ধারণ করলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।" (মুয়াত্তা মালিক)
শূরা বা পরামর্শ (মজলিস-উস-শূরা): ইসলামী শাসনব্যবস্থায় মজলিস-উস-শূরা বা পরামর্শ পরিষদের গুরুত্ব অপরিসীম। শাসককে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সাথে পরামর্শ করতে হয়।
"এবং তাদের যাবতীয় কাজ তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।" (সূরা শূরা, ৪২:৩৮)
আল্লাহ তা'আলা রাসূল (সা.)-কেও সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন:
"এবং কার্যে তাদের সাথে পরামর্শ করো।" (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)
আইনের শাসন (সিয়াদাতুল কানুন): ইসলামী শাসনে আইনের শাসন বিদ্যমান থাকবে। শাসক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সকলেই আইনের অধীন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং স্বৈরাচার ও পক্ষপাতমূলক বিচার নিষিদ্ধ থাকবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।" (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
জনগণের অধিকার সংরক্ষণ: রাষ্ট্রের সকল নাগরিক, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে তাদের মৌলিক অধিকার লাভ করবে। জান-মাল, ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, ইবাদত ও উপাসনার অধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা সনদের মাধ্যমে অমুসলিমদের অধিকার সুরক্ষা করেছিলেন। তিনি বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে (জিম্মিকে) কষ্ট দিল, অথবা তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করল, অথবা তার উপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপালো, অথবা তার কাছ থেকে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো কিছু গ্রহণ করল, আমি কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে বাদী হবো।" (সুনান আবু দাউদ)
আমানত ও জবাবদিহিতা: শাসক আল্লাহর কাছে এবং জনগণের কাছে আমানতদার (খলিফাতুল্লাহ)। তাদের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কোনো প্রকারের স্বৈরাচার বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ নেই।
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট প্রত্যর্পণ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন।" (সূরা নিসা, ৪:৫৮)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে শাসকের জবাবদিহিতা এবং জনগণের অধিকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল। তিনি জনগণের কাছে নিজের জবাবদিহিতা প্রকাশে দ্বিধা করতেন না।
ইসলামে রাজনীতির অপরিহার্যতা
ইসলামী পণ্ডিতগণ মনে করেন যে, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা অপরিহার্য। কারণ, যাকাত আদায়, শরীয়া আইন প্রয়োগ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ—এসব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া পুরোপুরি সম্ভব নয়। নবী করীম (সা.) মদীনায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এর বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেছেন। রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের (খুলাফায়ে রাশেদীন) জীবন ছিল একটি রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা স্থাপন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উপসংহার:
ইসলামের আলোকে রাজনীতি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম। এটি একটি এমন ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা যা পার্থিব কল্যাণ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। এই নীতিমালাগুলো অনুসরণ করে একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন সম্ভব, যা বিশ্বব্যাপী শান্তি ও ন্যায়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন